কিশোরগঞ্জ পৌরবাসীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করার স্বপ্ন নিয়ে নেওয়া হয়েছিল কোটি টাকার প্রকল্প। নির্মাণ করা হয়েছিল স্যানিটারি ল্যান্ডফিল, স্থাপন করা হয়েছিল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নানা অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি। উদ্দেশ্য ছিল—শহরের বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে গিয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ব্যবস্থাপনা করা, দূষিত পানি পরিশোধন এবং পরিবেশ রক্ষা।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। প্রকল্প বাস্তবায়নের কয়েক বছর পরও এর সুফল পাচ্ছেন না পৌরবাসী। প্রকল্পের অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি পড়ে থাকার অভিযোগের বিপরীতে শহরের বর্জ্য এখনো খোলা জায়গায় ফেলা হচ্ছে। ফলে কিশোরগঞ্জ-ভৈরব আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে তৈরি হয়েছে বিশাল ময়লার ভাগাড়।
প্রশ্ন উঠেছে—কেন এমন হলো? কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি প্রকল্প কীভাবে চালুর আগেই কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ল?
প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
তথ্য-উপাত্ত ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় জানা যায়, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে কিশোরগঞ্জ পৌর এলাকায় স্যানিটারি ল্যান্ডফিল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। চার একর জমিতে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়।
২০২১ সালের দিকে প্রকল্পের কাজ শুরু হয় এবং ২০২২ সালের শেষদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শেষ করে পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল পৌরসভার প্রতিদিনের বিপুল পরিমাণ বর্জ্যকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবস্থাপনা করা। কিন্তু প্রকল্প চালুর পরও প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি।
প্রকল্প আছে, কিন্তু বর্জ্য যাচ্ছে ভাগাড়ে
অনুসন্ধানে দেখা যায়, শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগৃহীত বর্জ্য এখনো নির্দিষ্ট কোনো আধুনিক প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনার বদলে বিভিন্ন স্থানে ফেলা হচ্ছে। এর সবচেয়ে দৃশ্যমান চিত্র কিশোরগঞ্জ-ভৈরব আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে।
দিনের পর দিন সেখানে বর্জ্য ফেলার কারণে ময়লার স্তূপ বড় হচ্ছে। দুর্গন্ধ ও পরিবেশদূষণের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা ও মহাসড়কে চলাচলকারী মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে।
একদিকে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো, অন্যদিকে তার পাশেই পুরোনো পদ্ধতিতে ময়লার ভাগাড়—এই বৈপরীত্যই প্রকল্পটির সফলতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তাহলে প্রকল্পটি ব্যর্থ হলো কেন?
অনুসন্ধানে প্রকল্পটির ব্যর্থতার সম্ভাব্য কয়েকটি কারণ সামনে এসেছে।
১. পরিচালন কাঠামোর দুর্বলতা:
প্রকল্প নির্মাণের আগে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও সাংগঠনিক কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছিল কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
২. পরিচালন ব্যয়ের সংস্থান:
কোনো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নির্মাণের পর নিয়মিত পরিচালনা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও জনবল বাবদ অর্থ প্রয়োজন। এ অর্থের স্থায়ী উৎস নির্ধারণ করা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
৩. প্রকল্প পরিকল্পনা বনাম বাস্তবতা:
প্রকল্প প্রণয়নের সময় পৌরসভার প্রতিদিনের বর্জ্যের পরিমাণ, ভবিষ্যতে বর্জ্য বৃদ্ধির হার, প্রয়োজনীয় জনবল ও পরিচালন সক্ষমতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না—এ প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন।
৪. যন্ত্রপাতির ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ:
প্রকল্পে স্থাপিত যন্ত্রপাতি নিয়মিত চালু না থাকলে সেগুলো নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এসব যন্ত্রপাতি বর্তমানে কী অবস্থায় আছে এবং কে এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে—তাও অনুসন্ধানের বিষয়।
৫. হস্তান্তরের পর দায়িত্ব:
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শেষ করে প্রকল্প হস্তান্তরের পর তা সচল রাখার জন্য পৌর কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছিল, তারও স্পষ্ট হিসাব প্রয়োজন।
কাগজে প্রকল্প, মাঠে ময়লার পাহাড়
অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানেই—প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য যদি ছিল পৌর এলাকার বর্জ্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ব্যবস্থাপনা করা, তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়নের কয়েক বছর পরও কেন পৌরসভার বর্জ্য খোলা জায়গায় ফেলা হচ্ছে?
একটি প্রকল্পের সাফল্য শুধু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার ওপর নির্ভর করে না। প্রকল্পটি নির্ধারিত লক্ষ্য অনুযায়ী কতদিন ও কতটা কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়েছে, সেটিই মূল বিবেচ্য।
সেই হিসেবে কিশোরগঞ্জ পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের বর্তমান পরিস্থিতি প্রকল্পটির পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
বর্তমান প্রশাসকের বক্তব্য
বিষয়টি নিয়ে বর্তমান পৌর প্রশাসক জেবুন নাহার শাম্মী-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে মতামত দিতে রাজি হননি। তিনি বিষয়টি অনেক আগের বলে জানান।
তবে প্রকল্পটি পুরোনো হলেও এর আর্থিক দায়, স্থাপনা ও যন্ত্রপাতি বর্তমানে পৌর কর্তৃপক্ষের সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কারণে প্রকল্পটির বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা থেকেই যায়।
দরকার স্বাধীন তদন্ত
কিশোরগঞ্জ পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পটি কেন প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি—এটি এখন শুধু পৌরসভার অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি জনগণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
তাই প্রকল্পটির বিষয়ে একটি স্বাধীন কারিগরি ও আর্থিক তদন্ত জরুরি।
তদন্তে অন্তত এসব বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন—
প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় কত ছিল;
প্রকৃতপক্ষে কত টাকা ব্যয় হয়েছে;
প্রকল্পের ডিপিপিতে কী কী কাজ ও সুবিধার কথা ছিল;
কাজের মান ও বাস্তব অগ্রগতি;
প্রকল্পের সব যন্ত্রপাতি বর্তমানে সচল নাকি অচল;
কাজ শেষ হওয়ার পর কেন প্রকল্পটি নিয়মিত চালু রাখা সম্ভব হয়নি;
পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অর্থ ও জনবল বরাদ্দ ছিল কি না;
প্রকল্প হস্তান্তরের পর দায়িত্ব কার ওপর ছিল;
প্রকল্পটি চালু না থাকায় সরকারি/উন্নয়ন সহযোগী অর্থের কোনো অপচয় হয়েছে কি না;
বর্তমানে প্রকল্পটি পুনরায় সচল করতে কত টাকা প্রয়োজন।
শেষ প্রশ্ন
কিশোরগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা ছিল—কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্প শহরের কোন কাজে লাগবে কি?

