বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র খান্দারের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে গেলে চোখে পড়ে একটি বিশাল প্রবেশদ্বার। উপরে লেখা `শহীদ চান্দু ক্রীড়া কমপ্লেক্স’ ফটকের ডানদিকে মার্বেল পাথরের একটি ফলকে এই নামকরণের উদ্বোধন তারিখ খোদাই করা আছে ২০০৩ সালের ৩ জুন। এই ফলকটিই আজ বগুড়ার বুকে এক বিশাল, অসম্পূর্ণ স্বপ্নের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই স্বপ্নটি ছিল বগুড়াকে ক্রীড়াঙ্গনের ‘সেকেন্ড হোম’ হিসেবে গড়ে তোলা এবং এর পেছনে যার সবচেয়ে বড় অবদান ছিল, তিনি হলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গেছে, সেই ফলকটি তার ঔজ্জ্বল্য হারায়নি, কিন্তু তার পেছনের স্বপ্নটি কালের গর্ভে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট যখন ক্ষমতায় আসে, তখন বগুড়ার উন্নয়নে দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল। তারেক রহমান যেখানে সামগ্রিক অবকাঠামোগত উন্নয়নে মনোনিবেশ করেছিলেন, সেখানে আরাফাত রহমান কোকোর স্বপ্ন ছিল ভিন্ন। তিনি বগুড়াকে উত্তরবঙ্গের ‘ক্রীড়া রাজধানী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল শুধু একটি আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম তৈরি করা নয়, বরং এমন একটি পূর্ণাঙ্গ ক্রীড়া কাঠামো তৈরি করা, যা থেকে জাতীয় পর্যায়ের অগণিত খেলোয়াড় তৈরি হবে এবং দেশের ক্রীড়া মানচিত্রে বগুড়ার একটি স্থায়ী, মর্যাদাপূর্ণ স্থান তৈরি হবে। এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি ২০০২ সালে শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামের আধুনিকায়নের কাজে হাত দেন।
স্টেডিয়ামটির আধুনিকায়নের পর এটি আইসিসি থেকে আন্তর্জাতিক ভেন্যুর মর্যাদা লাভ করে। এরপর এখানে আন্তর্জাতিক মানের একদিনের ও টেস্ট ম্যাচ আয়োজন শুরু হয়। ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক ভেন্যুর স্বীকৃতি পাওয়ার পর এই মাঠে পাঁচটি ওয়ানডে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়, যার মধ্যে বাংলাদেশ ৪টিতেই জয়লাভ করে। এই সাফল্য বগুড়াকে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য একটি ‘লাকি ভেন্যু’ হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়।
২০০৪ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে এই মাঠটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভেন্যু হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল, যা বগুড়ার জন্য এক বিশাল অর্জন ছিল। এই সাফল্যগুলো ছিল আরাফাত রহমান কোকোর ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফল, যা বগুড়ার ক্রীড়াঙ্গনের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।
আরাফাত রহমান কোকোর স্বপ্ন কেবল একটি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ ক্রীড়া কমপ্লেক্স গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।
বগুড়া জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম আর সিদ্দিক লেমন সে সময়ের কথা স্মরণ করে বলেন, “কোকো সাহেব বগুড়াকে ক্রীড়াঙ্গনের সেকেন্ড হোম বানাতে চেয়েছিলেন। তিনি শুধু ক্রিকেট নয়, সব ধরনের খেলাধুলাকে একই ছাদের নিচে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন।” তাঁর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের পাশেই একটি আধুনিক ফুটবল স্টেডিয়াম, আন্তর্জাতিক মানের সুইমিংপুল, অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন জিম, অ্যাথলেটিকস ট্র্যাক, ভলিবল কোর্ট, বাস্কেটবল গ্রাউন্ড এবং খেলোয়াড়দের জন্য একটি সুসজ্জিত আবাসিক হোটেল তৈরির কথা ছিল। তিনি স্টেডিয়ামের পাশে থাকা কৃষি খামারের কিছু অংশ ব্যবহার করে এই স্থাপনাগুলো নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিভিন্ন কারণে এই প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করতে পারেনি। রাজনৈতিক পালাবদল এবং সেই সময়ের ক্রীড়া সংগঠকদের নিজেদের মধ্যেকার মতবিরোধ এই স্বপ্নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
তাঁর আরেকটি বড় স্বপ্ন ছিল বগুড়াতে দেশের দ্বিতীয় বিকেএসপি (বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) প্রতিষ্ঠা করা। তিনি মনে করতেন, এই কমপ্লেক্স থেকে নিয়মিতভাবে জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড় তৈরি হবে এবং দেশের ক্রীড়া অঙ্গনে বগুড়ার অবদান বৃদ্ধি পাবে। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে স্টেডিয়ামের পশ্চিম পাশে একটি বাস্কেটবল গ্রাউন্ডও তৈরি করা হয়েছিল। এই স্টেডিয়ামটি ছিল তার স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু। কয়েক কোটি টাকার সুইমিং পুল যেন বিরান ভূমি। অথচ এখান থেকে বিগত দুই দশকে তৈরি হতো কত তরুণ সাঁতারু।
ক্রিকেটের প্রতি তাঁর বিশেষ ভালোবাসা ও দূরদর্শিতার প্রমাণ মেলে শ্রীলংকান কিউরেটর নন্দসেনাকে দিয়ে স্টেডিয়ামে দুটি বাউন্সি উইকেট তৈরি করানোর মধ্য দিয়ে। সেই সময় দেশের অন্য কোনো ভেন্যুতে এমন উইকেট ছিল না। আজও সেই উইকেটগুলো দেশের সেরা হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৯ দল এই উইকেটে অনুশীলন করেই বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, যা কোকোর দূরদর্শিতারই জ্বলন্ত প্রমাণ। তিনি খেলোয়াড়দের জন্য একটি অত্যাধুনিক ক্রিকেট একাডেমিও প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল খেলোয়াড়দের নিজস্ব আবাসিক হোটেলে রেখে দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, যা ছিল একটি পেশাদার ক্রীড়া সংস্কৃতি গড়ে তোলার অন্যতম পূর্বশর্ত।
২০০৭ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে সাথে বগুড়ার ক্রীড়াঙ্গনের চিত্রও পাল্টে যায়। রাজনৈতিক বিভাজন এবং সেই সময়ের ক্রীড়া সংগঠকদের মধ্যকার মতবিরোধ শহীদ চান্দু ক্রীড়া কমপ্লেক্সের স্বপ্নকে পূর্ণতা পেতে দেয়নি। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে এই স্টেডিয়ামের প্রতি অবহেলা শুরু হয়। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতার ছেলের স্বপ্নের এই কার্যক্রম হওয়ায় গত প্রায় ১৬ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকার এটিকে অবহেলার চোখে দেখে আসছে। ফলস্বরূপ, বগুড়ার মানুষ আন্তর্জাতিক মানের খেলা উপভোগ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে কোনো সংস্কার বা রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় স্টেডিয়ামের বর্তমান অবস্থা খুবই করুণ। আশপাশের রাস্তাগুলোর অবস্থাও নাজুক। বিগত সময়ে স্টেডিয়ামের কর্মকর্তারাও আক্ষেপ করে বলেছেন, “যার যেভাবে ইচ্ছে হচ্ছে, সে এখন সেভাবেই আন্তর্জাতিক মানের এই মাঠটি ব্যবহার করছে।” বিশেষ দিবসের কুচকাওয়াজ, ডিসপ্লে, বিনোদনমূলক খেলা, আলোচনা সভা, এমনকি কনসার্টের ভেন্যু হিসেবেও এই মাঠ ব্যবহৃত হচ্ছে।
কিছুদিন আগে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের জেলা প্রশাসনের কর্মচারীদের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার জন্য এখানে অস্থায়ী স্টেডিয়ামও নির্মাণ করা হয়েছিল। এই অব্যবস্থাপনার কারণে স্টেডিয়ামের সৌন্দর্য ও কার্যকারিতা দুটোই নষ্ট হচ্ছে। চারতলার কক্ষগুলো অপরিষ্কার, গ্যালারিতে শ্যাওলা জমেছে, খেলোয়াড়দের সাজঘর নোংরা, এবং বাথরুমগুলো শ্রীহীন। প্রেস বক্স অবহেলায় পড়ে আছে এবং স্কোরবোর্ডে মরিচা ধরেছে। আন্তর্জাতিক খেলা না থাকায় এই নান্দনিক স্টেডিয়ামটি তার অতীত ঐতিহ্য ও কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলছে।
শহীদ চান্দু ক্রীড়া কমপ্লেক্সের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলে বগুড়া সত্যিই উত্তরবঙ্গের ক্রীড়া রাজধানী হয়ে উঠতে পারত। এখান থেকে নিয়মিতভাবে জাতীয় পর্যায়ে খেলোয়াড় সরবরাহ করা যেত, বিশেষ করে ক্রিকেট ও ফুটবলে এই অঞ্চলের অপার সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলা ক্রীড়া সংস্থার আরেক সাবেক সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বলেন, “একটি সমন্বিত ক্রীড়া কমপ্লেক্স এই অঞ্চলের ক্রীড়াকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারত।”
আরাফাত রহমান কোকোর সেই স্বপ্নকে ভুলে যাওয়া মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে ভুলে যাওয়া নয়, বরং একটি অঞ্চলের ক্রীড়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করা। নতুন প্রজন্ম আরাফাত রহমান কোকো এবং তার মায়ের বগুড়া তথা দেশের ক্রীড়া উন্নয়নে কতটা অবদান রেখেছেন, তা জানার সুযোগই পাচ্ছে না।
রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে যদি এই স্বপ্নকে নতুন করে জাগিয়ে তোলা যায়, তাহলে হয়তো বগুড়া আবারও ক্রীড়াঙ্গনের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। যতক্ষণ না তা হচ্ছে, শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামের ফলকটি কেবল একটি স্মৃতিফলক হিসেবেই থাকবে, যা একটি অপূর্ণ স্বপ্নের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এটি শুধু একজন ব্যক্তিকে ভুলে যাওয়া নয়, বরং একটি অঞ্চলের ক্রীড়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করা। এটি কেবল একটি স্থাপনার অবহেলার গল্প নয়, বরং একটি অঞ্চলের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের অবরুদ্ধ হওয়ার করুণ উপাখ্যান।
এই স্টেডিয়ামের পূর্বনাম ছিল বগুড়া বিভাগীয় স্টেডিয়াম। ১৯৭৩ সালে বগুড়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা মাছুদুল আলম খান (চান্দু)-এর নামানুসারে বগুড়া জেলা ক্রীড়া সংস্থা স্টেডিয়ামটিকে শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম নামে নামকরণ করে। কোকোর আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ছিল এই স্টেডিয়ামের ইতিহাসে এক সোনালি অধ্যায়। সেই অধ্যায়ের গৌরব আজ মলিন।
এই মলিনতা শুধু একটি স্টেডিয়ামের নয়, বরং একটি স্বপ্ন, একটি অঞ্চলের ক্রীড়া সংস্কৃতির। বগুড়ার ক্রীড়াঙ্গনের এই স্থবিরতা দূর করতে, শহীদ চান্দু ক্রীড়া কমপ্লেক্সকে তার প্রাপ্য মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে এবং সেই অপূর্ণ স্বপ্নকে নতুন করে জাগিয়ে তুলতে সবারই এগিয়ে আসা উচিত।
লেখক: কালাম আজাদ
সাধারণ সম্পাদক, বগুড়া প্রেসক্লাব

